নিউমোনিয়া একটি মারাত্মক ফুসফুসের সংক্রমণ, যা বিশেষত শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এ রোগ হলে ফুসফুসের বায়ুথলি বা অ্যালভিওলাই প্রদাহগ্রস্ত হয় এবং এতে তরল জমে যায়। এর ফলে রোগীর শ্বাসকষ্ট, জ্বর, কাশি এবং বুকে ব্যথা দেখা দেয়। চিকিৎসা না করলে নিউমোনিয়া জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং অনেক সময় প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই নিউমোনিয়া সম্পর্কে সচেতনতা, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং কার্যকর চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিউমোনিয়ার কারণ
নিউমোনিয়ার প্রধান কারণ হলো সংক্রমণ। তবে এই সংক্রমণ বিভিন্ন প্রকার জীবাণুর কারণে হতে পারে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ব্যাকটেরিয়া
সবচেয়ে বেশি নিউমোনিয়া হয় ব্যাকটেরিয়ার কারণে। এর মধ্যে Streptococcus pneumoniae হলো প্রধান কারণ। এ ছাড়াও Haemophilus influenzae এবং Mycoplasma pneumoniae নিউমোনিয়ার অন্যতম কারণ।
২. ভাইরাস
ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, করোনাভাইরাস, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (RSV) ইত্যাদি ভাইরাস ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
৩. ছত্রাক (Fungal infection)
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা যারা দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে ছত্রাকজনিত নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে।
৪. পরিবেশগত কারণ
ধুলো, ধোঁয়া, রাসায়নিক পদার্থ বা ক্ষতিকর গ্যাসের সংস্পর্শে আসলে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৫. জীবনযাত্রাজনিত কারণ
- ধূমপান
- অপুষ্টি
- দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি রোগ
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া
নিউমোনিয়ার লক্ষণ
নিউমোনিয়ার লক্ষণ রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও সংক্রমণের কারণ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়:
- কাশি – শুষ্ক কাশি বা কফসহ কাশি। কফের সঙ্গে পুঁজ বা রক্ত থাকতে পারে।
- জ্বর ও শীত শীত ভাব – হঠাৎ উচ্চ জ্বর ওঠা নিউমোনিয়ার সাধারণ লক্ষণ।
- শ্বাসকষ্ট – শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, দ্রুত শ্বাস নেওয়া লাগে।
- বুকে ব্যথা – কাশি বা গভীর শ্বাসের সময় বুকে ব্যথা অনুভূত হয়।
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা – রোগীর শরীরে অবসাদ দেখা দেয়।
- ঘাম ও কাঁপুনি – তীব্র জ্বরের সঙ্গে শরীর কাঁপা।
- বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে – বিভ্রান্তি, মানসিক বিভ্রান্তি বা চেতনা হ্রাস হতে পারে।
- শিশুদের ক্ষেত্রে – দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুকে দম আটকে আসা, অস্বাভাবিক কান্না বা খাবারে অনীহা।
নিউমোনিয়ার জটিলতা
চিকিৎসা না করলে নিউমোনিয়া মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন:
- প্লুরাল ইফিউশন: ফুসফুসের চারপাশে তরল জমে যাওয়া।
- লাং অ্যাবসেস: ফুসফুসে পুঁজের থলি তৈরি হওয়া।
- সেপ্টিসেমিয়া: সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়া, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে।
- শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা: অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে জীবন–সংকট তৈরি হয়।
নিউমোনিয়ার ঝুঁকির কারণ
- ৫ বছরের নিচের শিশু
- ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক
- ধূমপায়ী ব্যক্তি
- দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগী
- দুর্বল ইমিউন সিস্টেম
নিউমোনিয়ার রোগ নির্ণয়
নিউমোনিয়ার সঠিক নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে থাকেন। যেমন:
- শারীরিক পরীক্ষা – ডাক্তার স্টেথোস্কোপ দিয়ে ফুসফুসের শব্দ শোনেন।
- বক্ষ এক্স–রে – ফুসফুসে সংক্রমণ, ফোলা বা তরল জমে যাওয়া বোঝা যায়।
- রক্ত পরীক্ষা – সংক্রমণের ধরণ বোঝার জন্য।
- কফ পরীক্ষা – কাশির কফ ল্যাবে পরীক্ষা করে কোন জীবাণুর কারণে নিউমোনিয়া হয়েছে তা নির্ধারণ করা হয়।
- পালস অক্সিমেট্রি – রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মাপা হয়।
নিউমোনিয়ার চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরণ, গুরুতরতা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর।
১. ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা
- অ্যান্টিবায়োটিক: ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
- অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ: ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে।
- অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ: ছত্রাকজনিত নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
- জ্বর ও ব্যথার ওষুধ: জ্বর ও বুকে ব্যথা কমাতে।
২. অক্সিজেন থেরাপি
রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়।
৩. হাসপাতাল ভর্তি
গুরুতর ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে নিবিড় পরিচর্যা দেওয়া হয়।
ঘরোয়া যত্ন
নিউমোনিয়ার সময় ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু যত্ন রোগীকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে:
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া
- প্রচুর পানি পান করা
- ধূমপান সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা
- হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
নিউমোনিয়ার প্রতিরোধ
নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব যদি সচেতনতা বাড়ানো যায়। কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হলো:
- টিকা গ্রহণ
- নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন
- ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন
- ধূমপান ত্যাগ করা
- সুষম খাদ্য গ্রহণ
- পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম
- হাত ধোয়ার অভ্যাস – সংক্রমণ থেকে বাঁচতে।
- ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এড়ানো – ধুলো, ধোঁয়া ও দূষিত পরিবেশে কম সময় থাকা।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদি নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দেয়, তবে দেরি না করে অবশ্যই বাংলাদেশের সেরা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এর কাছে যেতে হবে:
- কয়েক দিনের মধ্যে জ্বর ও কাশি না কমা
- শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া
- বুকে তীব্র ব্যথা
- কফে রক্ত আসা
- শিশুর খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক কান্না
উপসংহার
নিউমোনিয়া একটি গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ওষুধ, অক্সিজেন থেরাপি এবং সঠিক যত্নের মাধ্যমে নিউমোনিয়া পুরোপুরি সেরে ওঠা সম্ভব।
যদি আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও কাশিতে ভুগে থাকেন, তবে অবহেলা না করে দ্রুত বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এর শরণাপন্ন হোন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো যায় এবং সুস্থ জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।