ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন

ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন (ক্যারিয়ার সম্ভাবনা ২০২২)

ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন ফ্রিল্যান্সিং ভিত্তিক কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই অনেকেই জানতে চায়, ফ্রিল্যান্সিং করার জন্যে ‘ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন’ কোনটা শিখব? এই প্রশ্নের উত্তর জানার কৌতুহল কম-বেশি সকলেরই আছে।

আমরা সকলেই জানি, প্রযুক্তির এই যুগে ফ্রিল্যান্সিং ভিত্তিক কাজের চাহিদা গগণচুম্বী। এখন নিজ ঘরে বসেই ইন্টারনেটের সাহায্যে অনলাইনে থেকে আয় করা যায়।

ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে কম্পিউটার ভিত্তিক স্কিল ডেভেলপমেন্টে এগিয়ে আসা সময়ের দাবি।

আপনি জানলে অবাক হবেন, বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে যারা সফল, বেশির ভাগ ফ্রিলান্সারই ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের উপর কাজ করে। আবার এরই মধ্যে বড় একটি অংশ ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়েও কাজ করছে।

নতুন অবস্থায় আপনি ওয়েব ডিজাইন শিখবেন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখবেন এবং কোন কাজের অপর্চুনিটি বেশি তা ফাইন্ড আউট করতে না পারলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন

চাহিদাগত ভাবে ফ্রিল্যান্সিং এর কাজের জন্য ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন হাই ডিমান্ডেবল স্কিল। এই দুটি স্কিলই ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস গুলোর প্রথম সারির ক্যাটাগরি।

আপনি যদি Fiverr, UpWork, Freelancer ইত্যাদি মার্কেটপ্লেস গুলোকে প্রবেশ করেন তবে দেখবেন যে, উক্ত মার্টেকপ্লেস গুলোর প্রধান ক্যাটাগরিই হলো ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন।

তবে আপনার জন্য কোনটা শেখা ভালো হবে, ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন? এই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে আপনাকে বেশকিছু বিষয় বিশ্লেষণ করে তারপর ফাইনাল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।

আমি আপনাকে ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন উভয় স্কিলের সুযোগ -সুবিধা এবং এর সাধারণ পার্থক্যগুলো নিচে তুলে ধরেছি। এতে আপনার জন্য স্কিল নির্বাচন করা সহজ হবে।

ওয়েব ডিজাইন (Web Design)

ওয়েব ডিজাইন ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এই দুটি বিষয় অনেকটা আলাদা। আপনি যদি এই দুটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্কিল ডেভেলপ করতে চান, তবে আপনাকে বেশকিছু কোডিং বা ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে হবে। যেমন- HTML, CSS, JavaScript, jQuery ইত্যাদি।

এই ল্যাঙ্গুয়েজ শিখে আপনি যে কোনো ধরণের ওয়েবসাইটের ডিজাইনের কাজ সম্পূর্ণ করতে পারবেন। তবে এই ল্যাঙ্গুয়েজ গুলো ব্যবহার করে যেই ধরণের ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়, সেগুলোকে স্ট্যাটিক ওয়েবসাইট বলা হয়।

স্ট্যাটিক ওয়েবসাইটকে আরও সমৃদ্ধকরণ এবং সহজ করে ব্যবহার করার জন্যে আরও কিছু ল্যাঙ্গুয়েজ শেখার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন –  PHP, AHP ইত্যাদি।

বর্তমানে ৯৫ শতাংশ ওয়েবসাইটই বিভিন্ন CMS সফটওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে। তারমধ্যে রয়েছে – WordPress, Wix, Joomla, Shopify, Drupal, Magento ইত্যাদি।

আপনি যদি ওয়েবসাইট ডিজাইন নিয়ে কাজ করতে চান, তবে যে কোনো CMS software কে টার্গেক করে কাজ করতে পারেন। এতে করে সহজেই আপনার কাজে সমৃদ্ধি দেখতে পাবেন।

CMS সফটওয়্যার গুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ওয়ার্ডপ্রেস। সারাবিশ্বে ৪৭.৭ মিলিয়ন ওয়েবসাইট WordPress CMS দ্বারা নির্মিত। এটি PHP ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

তাছাড়া, বেশিরভাগ CMS সফটওয়্যারই PHP ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে তৈরি। আপনি যদি HTML, CSS, JavaScript, jQuery ইত্যাদি শেখার পাশাপাশি PHP ল্যাঙ্গুয়েজ শিখে নিতে পারেন, তবে প্রায় সকল CMS সফটওয়্যারেই কাজ করতে পারবেন।

আমি ওয়ার্ডপ্রেস নিয়ে কাজ করি। আপনিও ওয়ার্ডপ্রেসকে টার্গেট করুন। কেননা, ওয়ার্ডপ্রেস সবচেয়ে জনপ্রিয় সিএমএস, কাজও বেশি, শেখার ক্ষেত্রেও অনেক সুবিধা পাবেন।

অনেকেই মনে করেন, রেমিমেড কিছু থিমের কাস্টোমাইজেশনের কাজ শিখতে পারলেই ওয়ার্ডপ্রেস শেখা শেষ। এটা একটি ভূল তথ্য। এটা কেবল ওয়ার্ডপ্রেসের বেসিক পরিচিতি।

তবে সত্যিকার অর্থে ওয়েব ডিজাইন মূলত থিমের কাস্টোমাইজেশনের কাজকেই বুঝানো হয়। কিন্তু শুধুমাত্র এতটুকু স্কিল অর্জন করে টিকে থাকা যাবে না।

ক্লাইন্টেরা প্রায় সময়রই রেডিমেড থিমের বিভিন্ন কোড পরিবর্তন করে নতুন ফাংশন যুক্ত করা কথা বলে। এজন্য আপনাকে অবশ্যই ওয়েব ডিজাইনের পাশাপাশি ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজও শিখতে হবে।

তাই, যে কোনো ওয়েব ডিজাইনের জন্য HTML, CSS, JavaScript, jQuery ইত্যাদি শেখার পাশাপাশি PHP ল্যাঙ্গুয়েজ শেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রাফিক্স ডিজাইন (Graphics Design)

গ্রাফিক্স ডিজাইন অনেক সমৃদ্ধ একটি সেক্টর। এর প্রধান কাজ হলো আর্ট বা শিল্প। অর্থাৎ, একজন শিল্পী কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে মনেব ভাব, কল্পনা, তথ্য এবং গ্রাহকের ধারণার সমন্বয় ঘটিয়ে দৃশ্যমান ছবি অথবা ভিডিও তৈরি করে।

এক কথায় চিত্র দ্বারা নকশা তৈরি করাকে গ্রাফিক্স ডিজাইন বলা হয়। গ্রাফিক্স এর মধ্যে প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন- স্টিল ইমেজ গ্রাফিক, মোশন গ্রাফিক / ভিডিও গ্রাফিক ইত্যাদি।

তবে আমরা সাধারণত স্টিল ইমেজ গ্রাফিক এর কাজকেই গ্রাফিক্স ডিজাইন বলে জানি। গ্রাফিক্স ডিজাইন এমনই একটি বিষয়, যা দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সকল কাজের সাথেই ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে।

পোস্টার ডিজাইন, ব্যানার ডিজাইন, প্যাকেট ডিজাইন, লোগো ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, সফটওয়্যার ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন ইত্যাদি সকল কাজেই গ্রাফিক্স ডিজাইনের ব্যবহার অপরিহার্য।

ফ্রিল্যান্সিং ভিত্তিক ক্যারিয়ার গুলোর মধ্যেও গ্রাফিক্স ডিজাইন ক্যারিয়ার অনেক জনপ্রিয়। গ্রাফিক্স ডিজাইন করার জন্য বিভিন্ন ধরণের সফটওয়্যার রয়েছে।

তারমধ্যে রয়েছে, অ্যাডোবি ফটোশপ, অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর, অ্যাডোবি ইন ডিজাইন, ক্যানভা, কোরেলড্র ইত্যাদি।

আপনি যে গ্রাফিক্সের কাজ করার জন্যে যে কোনো ধরণের সফটওয়্যারের কাজ শিখতে পারেন, তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে অ্যাডোবি ফটোশপ, অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর এবং অ্যাডোবি ইন ডিজাইন সফটওয়্যারের কাজ শেখার কথা বলব।

Adobe এর প্রোডাক্ট গুলো বেশ উন্নত এবং জনপ্রিয়ও বটে। শেখার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা পাবেন এবং এর কাজও বেশি। তাছাড়া, গ্রাফিক্স ডিজাইনের অনেক এডভান্স কাজও এই সফটওয়্যার গুলোর মাধ্যমে করা যায়।

কোনটা সহজ কোন কঠিন?

স্বাভাবিক ভাবে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন কোনটা বেশি কঠিন? এর উত্তর হলো গ্রাফিক্স ডিজাইনের তুলনায় ওয়েব ডিজাইন অনেক কঠিন।

পূর্ণাঙ্গ ওয়েব ডিজাইন শেখার জন্য আপনাকে প্রায় ৬ মাস থেকে বছরের বেশি সময় দিতে হবে। অন্যদিকে গ্রাফিক্স ডিজাইন মাত্র ৩ মাস থেকে ৬ মাসের ভেতরেই কমপ্লিট করতে পারবেন।

তবে সময়ের হিসেবটা সবার জন্য এক নাও হতে পারে। যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বা যারা ফাস্ট লার্নার তাদের ক্ষেত্রে সময় অনেক কম লাগবে। অন্যদিকে যারা পুরোই নতুন বা স্লো লার্নার তাদের ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে।

আবার ওয়েব ডিজাইন শেখার ক্ষেত্রে অবশ্যই কম্পিউটার কিবোর্ডের টাইপিং স্কিল ভালো হতে হবে। গ্রাফিক্স ডিজাইনের ক্ষেত্রেও তাই।

তবে গ্রাফিক্স ডিজাইনের জন্য মোটামুটি টাইপিং স্কিল হলেও চলা যায়। কিন্তু ওয়েব ডিজাইনের ক্ষেত্রে অবশ্যই টাইপিং স্কিল ভালো হতে হবে।

কোন কাজে টাকা বেশি?

আমরা নিশ্চই সকলেই উপলদ্ধি করতে পারছি কোন কাজে টাকা বেশি হবে। স্বাভাবিক ভাবে যে কাজে পরিশ্রম বেশি সে কাজে টাকাও বেশি।

আপনার ঠিক ধরেছেন, গ্রাফিক্স ডিজাইন থেকে ওয়েব ডিজাইনে টাকা বেশি। তবে এটাও সত্য যে, গ্রাফিক্স ডিজাইন থেকে ওয়েব ডিজাইন অনেক কঠিন কাজ, পরিশ্রমও বেশি।

তবে উভয় স্কিলই ফ্রিল্যান্সিং এর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে সবচেয়ে বেশি কাজ হয় গ্রাফিক্স ডিজাইনের উপর। তাছাড়া, গ্রাফিক্স ডিজাইন অনেক সহজ এবং উন্মুক্ত বলা যায়।

এটা এজন্যই উন্মুক্ত যে, এটা শেখার জন্য আপনার খুব ভালো পড়াশোনা থাকার প্রয়োজন নেই। গণিত ও ইংরেজি স্কিল খুব ভালো না হলেও চলবে।

কিন্তু ওয়েব ডিজাইনের ক্ষেত্রে গাণিতিক স্কিলের পাশাপাশি ইংরেজি স্কিলও প্রয়োজন হয়। তাই সহজে অনলাইন থেকে টাকা আয় করার জন্য গ্রাফিক্স ডিজাইনকে বেশিরভাগ লোকই বেছে নেয়।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথাঃ

প্রিয় পাঠক, ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন কোন স্কিল অর্জন করলে আপনার জন্য সুইটেবল হবে তা আপনিই কেবল ফাইন্ড আউট করতে পারবেন। আমি কেবল ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

তবে একথা সত্য যে, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ওয়েব ডিজাইন উভয় স্কিলেই দারুণ ক্যারিয়ার অপর্চুনিটি রয়েছে। বাংলাদেশ থেকেই লক্ষ লক্ষ ফিল্যান্সার এই স্কিল গুলো উপর কাজ করছে। ইভেন আমিও করি।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং এর অগ্রগতির দিতে তাকালে প্রতীয়মান হয় যে, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স খাতে ফ্রিল্যান্সারেরা আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে।

সবশেষ আমি বলব, আপনার হাতে যদি সময় থাকে তবে ওয়েব ডিজাইন শিখুন। আর যদি সময় কম থাকে, তবে গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখতে পারেন। উভয় ক্যাটাগরিতেই লক্ষ লক্ষ কাজ এভেইলএবল।

Add comment

Posts

Your Header Sidebar area is currently empty. Hurry up and add some widgets.